June 21, 2026, 10:16 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
বাংলাদেশের স্বার্থ/ ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি জরুরী অনুকূল পরিবেশ হলে ভারত যাবেন প্রধানমন্ত্রী/বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বাস্তবতায় একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ যশোরে বিজিবির অভিযানে ৭ কোটি টাকার স্বর্ণের বারসহ দুই চোরাকারবারি আটক ইবিতে সচেতন খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে সচেতনতা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত দৌলতদিয়ায় এসবি বাস দুর্ঘটনার তদন্ত/ বাসের যান্ত্রিক ত্রুটি, ফিটনেস না থাকা, ঘাট অব্যবস্থাপনা দায়ী হঠাৎ মন্ত্রীর আগমন, উন্মোচিত কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সাপের আক্রমণ বাড়ছে, ২ সপ্তাহে কামড় ৮ জনের, মৃত্যু ১ মেসির হ্যাটট্রিকে দাপুটে জয়, বিশ্বকাপ অভিযান শুরু আর্জেন্টিনার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় সরকার—তথ্যমন্ত্রী তীব্র ইস্যুতে সংসদে বিরোধী দলের নীরবতা: কৌশল, সীমাবদ্ধতা নাকি দায়িত্বহীনতা?

বাংলাদেশের স্বার্থ/ ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি জরুরী

ড.আমানুর আমানের কলাম
তারেক রহমানের মালয়েশিয়া-চীন সফর: বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্য ও জাতীয় স্বার্থের নতুন অধ্যায়
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন সফরে গেছেন। এই সফরকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষত ভারতীয় গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারক মহলের একটি অংশ সফরটিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে চীনা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ককে কেবল আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে বিভিন্ন মহল ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। অতীতে বাংলাদেশের নতুন সরকারপ্রধানদের প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে ভারতকে দেখা গেলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকা ভিন্ন কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করেছে। তবে কোনো সফরের গন্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মূলত অর্থনৈতিক সুযোগ, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শ্রমবাজার এবং কৌশলগত স্বার্থের ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন তাকে বহুমাত্রিক কূটনীতি পরিচালনা করতে হচ্ছে। একদিকে ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্র। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী, অবকাঠামো বিনিয়োগকারী এবং প্রযুক্তিগত সহায়তাকারী দেশ। এছাড়া মালয়েশিয়া বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য।
সফরের প্রথম ধাপ মালয়েশিয়াকে ঘিরে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য অর্থনৈতিক। মালয়েশিয়ায় বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত রয়েছেন এবং নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় নিলে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবধর্মী সিদ্ধান্ত। সরকার যদি আরও বেশি সংখ্যক দক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিকের জন্য বাজার নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
চীন সফরকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন। গত এক দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য ছিল। তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যেকোনো বিদেশি বিনিয়োগ যেন দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে এবং ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি তৈরি না করে। উন্নয়ন সহযোগিতা গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রকল্পের বাস্তব উপযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ভারতীয় গণমাধ্যমের একাংশ এই সফরকে ভারতকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও বিস্তৃত। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। সে তার জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক চাহিদা এবং কৌশলগত প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করবে—এটাই স্বাভাবিক। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা মানেই অন্য দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ, ভারত ও চীন—এই তিন দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ঢাকা যদি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে, তাহলে তা দেশের জন্য সর্বাধিক সুফল বয়ে আনতে পারে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানিবণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য এবং কিছু রাজনৈতিক সংবেদনশীল ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে সময়ে সময়ে প্রভাব ফেলেছে। তবে একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতাও উল্লেখযোগ্য। তাই বাংলাদেশের স্বার্থে ভারতকে উপেক্ষা করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি চীন বা অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত রাখাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
চীনের পক্ষ থেকে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে—চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে যেন শুধুমাত্র ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার দৃষ্টিতে দেখা না হয়—তা আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি পরিচিত অবস্থান। তবে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেকোনো অংশীদারিত্ব যেন দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে প্রভাবিত না করে। উন্নয়ন সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্পর্ক অবশ্যই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ‘এক দেশের সঙ্গে, অন্য দেশের বিরুদ্ধে’—এই ধরনের কূটনীতি ক্রমশ অকার্যকর হয়ে উঠছে। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে বাংলাদেশকে বহুমুখী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতির সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ক উন্নয়ন করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে সফর থেকে বাংলাদেশ কী অর্জন করতে পারে তার ওপর। যদি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, প্রযুক্তি সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয় এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাস্তব অগ্রগতি আসে, তাহলে এই সফর সফল হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যদিকে যদি সফর শুধুমাত্র প্রতীকী কূটনৈতিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর তাৎপর্য তুলনামূলকভাবে কমে যাবে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়” নীতির আধুনিক ও বাস্তবমুখী প্রয়োগ। মালয়েশিয়া, চীন, ভারত কিংবা অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের কল্যাণ। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার দাবার বোর্ডে কোনো পক্ষের ঘুঁটি না হয়ে, নিজের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাওয়াই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই কৌশল।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

MonTueWedThuFriSatSun
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930 
© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net